আজ বুধবার, ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাদ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশ, প্রস্তুতি কতটুকু

editor
প্রকাশিত মে ১৬, ২০২৬, ০২:২৫ অপরাহ্ণ
খাদ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশ, প্রস্তুতি কতটুকু

Manual1 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের মানচিত্র ক্রমেই আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে মাত্র ১০টি দেশ। সেই তালিকায় এবার বাংলাদেশের নামও উঠে এসেছে।

জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’-এ বলা হয়েছে— বিশ্বে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশের অবস্থান আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে— ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগেছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে একদিকে যেমন কিছু উন্নতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, অপরদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তাও রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি সত্যিই খাদ্য সংকট থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, নাকি সংকটের গভীরতা এখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করা হয়নি?

খাদ্য সংকটের নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশে খাদ্য সংকট এখন আর শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতার সংকট নয়, বরং এটি ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বৈষম্যের সম্মিলিত সংকটে রূপ নিয়েছে।

গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রায় এককোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক পর্যায় ৩’-এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। আরও প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ছিল ‘জরুরি পর্যায় ৪’-এ। অর্থাৎ বিপুল জনগোষ্ঠী এমন এক অবস্থায় রয়েছে, যেখানে তারা নিয়মিত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে।

Manual3 Ad Code

যদিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বড় ধরনের দুর্যোগ না হওয়া, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই উন্নতি এখনও ভঙ্গুর এবং অস্থায়ী।

কারণ, দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ এখনও খাদ্য ব্যয়ের চাপে বিপর্যস্ত। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, সবজি—প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য বহু পরিবারকে খাদ্যাভ্যাস বদলাতে বাধ্য করেছে। অনেক পরিবার প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কমিয়ে দিয়েছে, কেউ কেউ ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছে, আবার অনেকে স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে খাদ্য ব্যয় সামাল দিচ্ছে।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে জলবায়ু ও বন্যা

খাদ্য সংকট থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, সেটি বুঝতে হলে দেশের কৃষি বাস্তবতা দেখতে হবে। আর সেই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পুনরাবৃত্ত বন্যা।

এ বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকার পাকা বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু কয়েকটি জেলাতেই কয়েক হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সুনামগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এ ধরনের বন্যা এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় হাওর অঞ্চলে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমি ডুবে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে বহু ধাপের বন্যায় প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ জলবায়ু দুর্যোগ এখন মৌসুমি ঝুঁকি নয়, বরং স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় খাদ্য নিরাপত্তার প্রস্তুতি মানে শুধু খাদ্য মজুত বাড়ানো নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল কৃষি, দ্রুত বন্যা মোকাবিলা, কৃষকের ক্ষতিপূরণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নেওয়া।

Manual6 Ad Code

খাদ্যে ভর্তুকি কমছে, বাড়ছে শঙ্কা

এমন এক সময়ে সরকার খাদ্যে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা করছে, যখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোই খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে খাদ্যে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হতে পারে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৬১৪ কোটি টাকা কম। চলতি অর্থবছরে মূল বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বাড়িয়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকা করা হয়। এখন আবার সেই বরাদ্দ কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

Manual7 Ad Code

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ভর্তুকি কমানো হলে টিসিবি, ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও নিম্ন আয়ের মানুষের সরকারি সহায়তা কার্যক্রমে চাপ বাড়তে পারে। কারণ এখনও খাদ্য মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

অপরদিকে সরকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং সারে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো—উৎপাদন ও কৃষি সচল রাখতে এসব খাতকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, খাদ্যনিরাপত্তা যখন বৈশ্বিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে, তখন সরাসরি খাদ্য সহায়তা ও ভর্তুকি কমানো কতটা বাস্তবসম্মত?

সামাজিক নিরাপত্তা কি বিকল্প হতে পারবে?

Manual2 Ad Code

সরকার অবশ্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বড় আকারে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা।

সরকারের পরিকল্পনায় পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষি সহায়তা, নগদ ভাতা, খাদ্য সহায়তা ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে একত্রে আনার কথা বলা হচ্ছে। এটিকে ‘কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা’র নতুন কাঠামো হিসেবে তুলে ধরতে চায় সরকার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ ইতিবাচক হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্রদের বড় অংশ বিভিন্ন কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়। আবার রাজনৈতিক প্রভাব, তালিকা জটিলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সহায়তা বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হয়। অর্থাৎ শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না, বরং প্রয়োজন কার্যকর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন।

‘এটি শুধু খাদ্যের সংকট নয়, বৈষম্যের সংকট’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মূলত একটি কাঠামোগত সংকট।

তার মতে, খাদ্যের বাজারে সরবরাহ থাকলেও অনেক মানুষের সেই খাদ্য কেনার সক্ষমতা নেই। নিম্ন আয়, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক বৈষম্য, জলবায়ু ঝুঁকি, অপুষ্টি এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি শুধু সাময়িক চাপ নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে দিচ্ছে। মানুষ কম পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে, স্বাস্থ্য ব্যয় কমাচ্ছে, ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।’’

তার মতে, রেমিট্যান্স কিছুটা স্বস্তি দিলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ দেশের সব পরিবার প্রবাসী আয়ের সুবিধা পায় না। ভূমিহীন শ্রমিক, শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক এবং নারীপ্রধান পরিবারগুলো এখনো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রস্তুতি কতটুকু?

বাংলাদেশ খাদ্য সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে—এটি সত্য। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো, কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, সারে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, খাদ্য মজুত ধরে রাখা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা— এসব উদ্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলার জন্য আরও বড় ধরনের কাঠামোগত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি—জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বড় বিনিয়োগ, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য স্থায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। এছাড়াও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য সহায়তা, পুষ্টিনিরাপত্তাকে খাদ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা।

একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন, উন্নত বীজ, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের জন্য সহজ অর্থায়ন বাড়ানোও জরুরি হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—খাদ্যকে শুধু কৃষি বা বাজারের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ খাদ্য সংকট শুধু ক্ষুধার নয়, এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, অপুষ্টি এবং সামাজিক অস্থিরতারও সংকট। আর সেই সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি যত দেরি হবে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি ততই গভীর হবে।

তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিউবিউন