শৈশব স্মৃতি স্মরণ করতে গেলে আমার একটি দৃশ্য খুব মনে পড়ে! আমি উচ্চ স্বরে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে পড়ছি আর আমার মা আমার পাশে বসে আছে ! উনার চোখ বন্ধ কিন্তু কান খাড়া! কোন একটি শব্দ উচ্চারণে সমস্যা হলেই সাথে সাথে সংশোধন করে দিচ্ছেন ! পড়া মুখস্থ করে তাকে শোনাতে পারলে তবেই ছুটি !
এর মধ্যে পানি খাবার অজুহাতেও উঠে যাবার উপায় নাই ! উনার চেহারা ভাবলেশহীন কিন্তু এটা জানি তার চেয়ারের হাতলের পাশে বেত, স্কেল অথবা চিরুনি আছে !
বিটিভিতে হুমায়ুন আহমেদের ধারাবাহিক নাটক শুরু হয়েছে! আব্বা উঠে এসে আম্মাকে ডেকে গেলেন ! আমি বুঝতে পারছি, আম্মাজান ভেতরে ভেতরে ছটফট করছেন কিন্তু বাইরে যথাসাধ্য শান্ত থাকার চেষ্টা করছেন! তখন ইন্টারনেটের যুগ নয় যে এখন মিস করলে পরে নেটে দেখা যাবে ! মিস মানে মিস ! তারপরও আম্মা চোখমুখ শক্ত করে বসে আছেন – আমার ক্লাস টেস্টের পড়া এখনও তৈরি হয়নি !
পড়া নিয়ে যখন তিনি উঠলেন তখন নাটকের ঐ পর্বের শেষ দৃশ্য চলছে !
এমনি কত ত্যাগ স্বীকার যে তিনি করেছেন ! সচিবের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও বেশিরভাগ অনুষ্ঠান তিনি পরিহার করতেন আমাদের দু’বোনের জন্য ! শত অসুস্থতার মাঝেও আমাদের স্কুলে দিয়ে আসতেন- নিয়ে আসতেন!
আমি যখন কারাগারে গেলাম তখন প্রথম দিকে মনে হতো আমার মায়ের পরিশ্রম বুঝি বৃথা গেল ! কি লাভ হলো, এত পড়াশোনা করে ?? পড়াশোনার চেয়ে ক্ষমতা, অর্থ, লবিং এসবের দাম হয়তো বেশি!
তারপরেই মনে হলো, পড়াশোনা লব্ধ জ্ঞান এমন এক শক্তি যা কেউ কখনো কেড়ে নিতে পারেনা! ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়, আত্মীয়তা বন্ধন ছিন্ন হয় কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা কবর পর্যন্ত সাথে থাকে ! তাই তো,
আজও আমি লড়াই করছি – আমার সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি আমার শিক্ষা! আমার মাকে আমি কখনও হারতে দিবনা ! কখোনো না ! প্রমান করবো আমার মায়ের পরিশ্রম বৃথা যায়নি ! সৃষ্টিকর্তা কখনও মায়েদের পরিশ্রম বৃথা যেতে দেন না !
আজ যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে- আমি জানি, তাদের চেয়েও বহুগুণ পরিশ্রম আর ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের অভিভাবকরা! উনাদের পরিশ্রম সার্থক হোক !
তোমরা তোমাদের বাবা মায়ের চেষ্টা বিফল হতে দিও না ! আশানুরূপ নয – আশাতীত ভালো রেজাল্ট করে দেখিয়ে দাও !