বার নির্বাচনে ‘হস্তক্ষেপ ও হয়রানি’, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিটিশ আইনি সংস্থার চিঠি
বার নির্বাচনে ‘হস্তক্ষেপ ও হয়রানি’, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিটিশ আইনি সংস্থার চিঠি
editor
প্রকাশিত মে ১৬, ২০২৬, ০১:২০ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
Manual8 Ad Code
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচনে প্রার্থিতায় বাধাসহ নানা অভিযোগ ওঠার পর উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়েছে যুক্তরাজ্যের দ্য ল সোসাইটি অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস।
এর আগে একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী সংস্থা কাউন্সিল অব বার্স অ্যান্ড ল সোসাইটিজ অব ইউরোপ (সিসিবিই)।
Manual1 Ad Code
ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের দুই লাখেরও বেশি সলিসিটরের প্রতিনিধিত্বকারী ব্রিটিশ সংগঠন দ্য ল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মার্ক ইভান্স স্বাক্ষরিত চিঠিটি গত বুধবার পাঠানো হয়।
সেখানে আইনি পেশার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও স্বশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লিখিত বার্তায় তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত করছি যে এই চিঠিটি সঠিক এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ল সোসাইটির পক্ষ থেকে ইস্যু করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচন হয়েছে। ১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে দুই দিনে ভোট দিয়েছেন ৪ হাজার ৪৮ জন; ভোট পড়ার হার ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রায় ৪০ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগ ও এর ভ্রাতৃপ্রতীম বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বার নির্বাচনগুলোতে ‘নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের’ ঘটনা ঘটেছে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে ল সোসাইটি বলেছে, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত বহু আইনজীবী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়েছে, মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক হেনস্থারও শিকার হতে হয়েছে।”
সংস্থাটি অভিযোগ করে বলেছে, “কিছু ক্ষেত্রে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ হওয়ার অজুহাতে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া, পুলিশ হস্তক্ষেপ করে কিছু প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহারে চাপ দিয়েছে অথবা পূর্ববর্তী সরকারের সহযোগী আখ্যা দিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধা দিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।”
এসব কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের ‘বেসিক প্রিন্সিপালস অন দ্য রোল অফ লয়ার্স’ বা আইনজীবীদের ভূমিকা সংক্রান্ত মৌলিক নীতিমালার ১৬, ১৭, ১৮ এবং ২৩ নম্বর নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ ‘অসঙ্গতিপূর্ণ’ বলে প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেয় সংস্থাটি।
নীতি ১৬-এর কথা তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়, “আইনজীবীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া, স্বেচ্ছাচারীভাবে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা, অথবা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া সরাসরি এই নীতিকে ক্ষুণ্ন করে। এই ধরনের কাজ আইনি পেশার স্বশাসনে অনুচিত হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।”
Manual5 Ad Code
প্রার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের কথিত সম্পৃক্ততা ভুক্তভোগীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে তুলে ধরে সংস্থাটি বলছে, এটি নীতি ১৭-এর পরিপন্থি।
আইনজীবীদের গায়ে রাজনৈতিক তকমা লাগানোর সমালোচনা করে চিঠিতে বলা হয়েছে, “প্রার্থীদের ‘সহযোগী’ বা ‘দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করার যে খবর পাওয়া গেছে, তা জাতিসংঘের নীতি ১৮-এর পরিপন্থি। কারণ, এটি আইনজীবীদের পরিচয়ের রাজনীতিকরণ করে এবং পেশাগত আচরণের পরিবর্তে অনুমিত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে তাদের শাস্তির ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।”
বার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের এই ঘটনাগুলোকে আইনি পেশার স্বাধীনতা খর্ব ও আইনের শাসনকে দুর্বল করার একটি সুস্পষ্ট ‘ছক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ল সোসাইটি।
চিঠির শেষাংশে সংস্থাটি বাংলাদেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেছে।
চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মনোয়নপত্র নিতে গেলে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মনোয়নপত্র নিতে গেলে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফাইল ছবি
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
Manual1 Ad Code
• কোনো বৈষম্য ছাড়াই সকল আইনজীবীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনগুলো পরিচালনা করা।
• সংশ্লিষ্ট সকল বার অ্যাসোসিয়েশনে নির্বাচনি ‘অনিয়ম, বাধা সৃষ্টি, হয়রানি বা সহিংসতার’ অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করা।
• বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা বজায় রাখতে সব আইনজীবী যেন কোনো রকম প্রতিশোধ, বাধা বা ভীতি প্রদর্শনের ভয় ছাড়াই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা।
এই চিঠির অনুলিপি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার, ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার, জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বার নির্বাচনে ‘অনিয়ম ও অগণতান্ত্রিক’ চর্চা বন্ধের দাবি জানিয়ে গত ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল কাউন্সিল অব বারস অ্যান্ড ল সোসাইটিজ অব ইউরোপ (সিসিবিই)।
ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশের (জেএমবিএফ) তথ্যের বরাত দিয়ে সিসিবিই সভাপতি রোমান জাভর্শেক ওই চিঠিতে বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একাধিক জেলা বার ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে চরম অগণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করেছে।
সিসিবিই-এর চিঠিতেও অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি, মনোনয়ন জমাদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেককে পূর্ববর্তী সরকারের বা ‘ফ্যাসিস্টদের সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে প্রার্থিতা বাতিল এবং পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগের দাবি করা হয়।
ল সোসাইটির মতো সিসিবিই-ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে বৈষম্যহীন অংশগ্রহণ, সুষ্ঠু তদন্ত ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানায়। এসব দাবির পক্ষে জাতিসংঘের ১৬, ১৭, ১৮ ও ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংস্থাটি কাউন্সিল অব ইউরোপের আইন পেশার সুরক্ষাসংক্রান্ত নতুন কনভেনশনে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও অনুমোদনের আহ্বান জানায়।সুএঃ বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর